FatwaBD logoFatwa.BD
সাধারণ মিনিট১৮৯

ঈদুল আযহার ফজিলত ও ৭ টি করণীয়



যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ। ঈদুল আযহার দিন।

ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয় — এটি একটি মহাপরীক্ষার স্মারক।


আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে তাকবীরের ধ্বনি।

আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার।

লক্ষ লক্ষ মানুষ একই নিয়তে, একই রবের দরবারে হাজির।


এই দিনটি মনে করিয়ে দেয় সেই মহামুহূর্তের কথা — যখন একজন বাবা প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর হুকুমে শুইয়ে দিয়েছিলেন মাটিতে। একটুও কাঁপেননি হাত। একটুও টলেননি মন।

সেই বাবার নাম — ইবরাহীম (আ.)।


আল্লাহ তাআলা সেই মহামুহূর্তের কথা কুরআনে চিরকালের জন্য ধরে রেখেছেন —


وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ


"আমি তার পরিবর্তে এক মহান কুরবানি দিলাম।"

(সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১০৭)



🌿 ঈদের রাতের ফজিলত ও ইবাদত


ঈদের রাত — অর্থাৎ যিলহজ্জের ৯ তারিখ সন্ধ্যা থেকে ১০ তারিখ ভোর পর্যন্ত — এক অসাধারণ বরকতের রাত।


রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —


مَنْ أَحْيَا لَيْلَتَيِ الْعِيدِ أَحْيَا اللهُ قَلْبَهُ يَوْمَ تَمُوتُ الْقُلُوبُ


"যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান প্রত্যাশা করে ইবাদত করে, তার হৃদয় সেদিন মরবে না যেদিন অন্যান্য হৃদয় মরবে।"

(সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৮২)


এই রাতকে কোনো কোনো বর্ণনায় "লাইলাতুল জায়িযা" বা পুরস্কারের রাত বলা হয়েছে।


এই রাতে যা করবেন —

নফল নামাজ — তাহাজ্জুদ ও সালাতুত তাসবিহ

কুরআন তিলাওয়াত ও গভীর চিন্তা-ভাবনা

তাকবীর, তাসবিহ, তাহলীল ও দরূদ শরীফ

দোয়া ও ইস্তিগফার

আল্লাহর স্মরণে রাত জাগরণ



🌿 কুরবানির দিনে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় আমল


রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —


مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ


"কুরবানির দিনে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে আর কোনো আমল বেশি প্রিয় নয়।"

(জামে তিরমিযী, হাদীস ১৪৯৩)


কিন্তু আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন — তিনি গোশত বা রক্ত চান না।


لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ


"আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত। বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।"

(সূরা আল-হজ্জ, আয়াত ৩৭)


ভাবুন একবার — কুরবানির ছুরি চলে পশুর গলায়, কিন্তু আসল কুরবানি হয় মনের ভেতরে।




🌿 যারা কুরবানি দিতে পারছেন না তাদের জন্য


সামর্থ্য না থাকলে মন ছোট করবেন না।

এই দিনের রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।


রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —


أَيَّامُ التَّشْرِيقِ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ وَذِكْرٍ لِلَّهِ


"আইয়ামে তাশরীক হলো খাওয়া, পান করা এবং আল্লাহর যিকরের দিন।"

(সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৪১)


যিকর, দোয়া, ইস্তিগফার — এগুলো সবার জন্য খোলা।

সামর্থ্যহীন বান্দার আন্তরিক দোয়াও আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না।




🌿 ঈদের দিনের আমল ও করণীয়


এই দিনের আমলগুলো সহজ, কিন্তু ফজিলত অসীম।


প্রথমত — তাকবীরে তাশরীক পড়ুন।

যিলহজ্জের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর —


اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ وَلِلّٰهِ الْحَمْدُ


পুরুষরা জোরে, নারীরা আস্তে। একটিও ওয়াক্ত ছুটে যেতে দেবেন না।


দ্বিতীয়ত — গোসল করুন ও সুন্দর পোশাক পরুন।

ঈদের নামাজের আগে গোসল করা মুস্তাহাব। সেরা পোশাক ও সুগন্ধি ব্যবহার করুন। আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।


তৃতীয়ত — ঈদের নামাজ পড়ুন।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন — "আমাদের এই দিনের প্রথম কাজ হলো নামাজ পড়া।"

(সহীহ বুখারী:৯৬৮)

নামাজের আগে কিছু না খেয়ে যাওয়া সুন্নাহ। কুরবানির মাংস থেকেই প্রথম খাওয়া উত্তম।


চতুর্থত — কুরবানি করুন খালেস নিয়তে।

লোক দেখানোর জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। মনে মনে বলুন — ইয়া আল্লাহ, এই ত্যাগ কেবল তোমার জন্য।


পঞ্চমত — মাংস তিন ভাগ করুন।

এক ভাগ নিজের পরিবার। এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন। এক ভাগ গরিব-মিসকিন।

ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণ হয়, যখন পাশের মানুষটিও হাসে।


ষষ্ঠত — বেশি বেশি যিকর ও দোয়া করুন।

এই দিনগুলো আল্লাহর স্মরণের দিন। ফোন নামিয়ে রাখুন কিছুক্ষণ। আল্লাহর দিকে ফিরুন।


সপ্তমত — পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন।

কুরবানির বর্জ্য যত্রতত্র ফেলবেন না। পৃথিবী আল্লাহর আমানত। এর সংরক্ষণও ইবাদত।




🌿 যা থেকে বিরত থাকবেন


প্রথমত — কুরবানির আগে চুল-নখ কাটবেন না।

যিলহজের প্রথম দশকে চুল-নখ না কাটলে একটি কুরবানির সম পরিমাণ সওয়াব হয়। অনেকে এই ফজিলতের বিষয় জানেন না।


দ্বিতীয়ত — লোক দেখানো নিয়ত থেকে বাঁচুন।

আল্লাহ বলেছেন — তাঁর কাছে পৌঁছায় শুধু তাকওয়া, গোশত বা রক্ত নয়।


তৃতীয়ত — হারাম কাজ থেকে দূরে থাকুন।

গান-বাজনা, অশ্লীলতা, ঝগড়া-বিবাদ, অপব্যয় — এগুলো ঈদের পবিত্রতা নষ্ট করে।


চতুর্থত — সময় অবহেলায় নষ্ট করবেন না।

এই দিনটি আল্লাহর বিশেষ দিন। অর্থহীন আড্ডা বা স্ক্রিনে সময় নষ্ট না করে পরিবার ও ইবাদতে মনোযোগ দিন।




🌿 শেষ কথা


ঈদুল আযহা বছরে একবারই আসে।

এই দিনে ইবরাহীম (আ.) দেখিয়ে গেছেন — আল্লাহর হুকুমের সামনে সবকিছু তুচ্ছ।


এই ঈদে শুধু পশু নয় — মনের অহংকার, লোভ, গাফিলতি — সবকিছু কুরবানি হোক আল্লাহর পথে।


একটি খালেস নিয়ত, একটি আন্তরিক দোয়া, একটি সত্যিকারের ত্যাগ — হয়তো সেটাই আপনার জীবন বদলে দিতে পারে।


আল্লাহ আমাদের সকলের কুরবানি কবুল করুন।

আমিন। 🤲