FatwaBD logoFatwa.BD
সাধারণ মিনিট২৪০
কেমন কাটতো নেককারদের ঈদের দিন?
M
Mufti Elias Khanমুফতি

মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া, ঢাকা

ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দের মৌসুম। মেহেরবান আল্লাহ আমাদের জন্য দুটি ঈদ দান করেছেন। তবে মুমিনের আনন্দ-উদযাপন আর অমুসলিমের আনন্দ-উদযাপন এক হতে পারে না। 

মুমিনের আনন্দ হয় আল্লাহর পছন্দনীয় আমলের মাধ্যমে। মহান আল্লাহ মুমিনদের উদ্দেশে বলেন:

قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَ بِرَحْمَتِهٖ فَبِذٰلِكَ فَلْیَفْرَحُوْا هُوَ خَیْرٌ مِّمَّا یَجْمَعُوْنَ

"বলুন, এসব আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতেই হয়েছে। সুতরাং এতেই তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা-কিছু পুঞ্জীভূত করে, তা অপেক্ষা এটা শ্রেয়!" (সূরা ইউনুস, ১০:৫৮)


সালাফে সালেহীন বা আমাদের নেককার পূর্বসূরিরা কীভাবে ঈদ উদযাপন করতেন, তা পর্যালোচনার মাধ্যমে আমরা প্রকৃত ঈদের স্বাদ খুঁজে পেতে পারি।


১. অমুসলিমদের উৎসব বর্জন ও সুন্নাহর অনুসরণ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমনের পর দেখেন, মদীনাবাসী বছরে দুই দিন (জাহেলী যুগের উৎসবে) আনন্দ-ফুর্তি করে। তখন তিনি ইরশাদ করেন, 


إِنّ اللهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْأَضْحَى، وَيَوْمَ الْفِطْرِ


"আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে এ দুই দিনের বদলে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন— ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর।" (সুনানে আবু দাউদ ১১৩৪; সুনানে নাসাঈ ১৫৫৬)


নেককারদের কাছে ঈদ মানে কেবল পার্থিব আমোদ-প্রমোদ ছিল না। হাসান বসরী (রাহ.)-এর মতে, ঈদ হলো ইবাদতের পূর্ণতা। তিনি বলতেন,


أما يوم الفطر فصلاة وصدقة وأما يوم الأضحى فصلاة ونسك


"ঈদুল ফিতর হলো ঈদের নামায পড়া ও সদাকাতুল ফিতর আদায় করা এবং ঈদুল আযহা হচ্ছে ঈদের নামায পড়া ও কুরবানী করা।" (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ৫/৩৮৬)


২. ক্ষমা ও পুরস্কার লাভই আসল আনন্দ

সালাফদের অনুভূতি ছিল— ঈদ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা পাওয়ার আনন্দের দিন। ইবনে রজব হাম্বলী (রাহ.) বলেন, ঈদুল ফিতরের দিন আল্লাহ তায়ালা রোজাদারদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, ফলে গোনাহগাররাও নেককারদের দলে শামিল হয়ে যায়। (লাতাইফুল মাআরিফ, পৃ. ২৩৭)


এ কারণেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ঈদের দিন বলতেন,


مَنْ هَذَا الْمَقْبُولُ مِنَّا فَنُهَنِّيهِ، وَمَنْ هَذَا الْمَحْرُومُ مِنَّا فَنُعَزِّيهِ، أَيُّهَا الْمَقْبُولُ هَنِيئًا لَكَ، أَيُّهَا الْمَرْدُودُ جَبَرَ اللَّهُ مُصِيبَتَكَ


"জানি না, আমাদের মধ্যে কে কবুল বা পুরস্কৃত, তাকে আমরা অভিনন্দন দিতাম! আর কে বঞ্চিত, তার জন্য আমরা শোক প্রকাশ করতাম! হে কবুল হওয়া ব্যক্তি! তোমাকে অভিনন্দন। হে বঞ্চিত! আল্লাহ তোমার ক্ষতিপূরণ করুন।" (লাতাইফুল মাআরিফ, পৃ. ২৩৫)


আবু মানছুর শীরাজী (রাহ.)-এর ভাষায়— ঈদ তো কেবল তার জন্য যার গুনাহ মাফ করা হয়েছে, 


لَيْسَ الْعِيْدُ لِمَنْ غَرَفَ لَهُ إِنَّمَا الْعِيْدُ لِمَنْ غُفِرَ لَهُ


"যাকে অঞ্জলি ভরে দান করা হলো ঈদ তার জন্য নয়। ঈদ তো হলো ঐ ব্যক্তির জন্য, যার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হলো।" (মুজামুস সাফার, পৃ. ৩০২)


৩. খুশির দিনেও তাকওয়ার প্রতিফলন

সালাফগণ ঈদের দিনেও আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত হওয়া থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতেন। ওয়াকী ইবনুল জার্রাহ (রাহ.) বলেন, ঈদের দিন সুফিয়ান সাওরী (রাহ.)-এর সাথে বের হলাম, তিনি বললেন,


إن أول ما نبدأ به في يومنا غض أبصارنا


"আজকের দিন যে কাজের মাধ্যমে আমরা ঈদের সূচনা করব তা হলো দৃষ্টির হেফাযত করা।" (আল-ওয়ারা, ইবনে আবিদ দুনিয়া, পৃ. ৬৩)

নেককারদের নিকট ঈদ নতুন পোশাকের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। 


ইবনুল জাওযী (রাহ.) বলেন,


إنما العيد لبس توبة عاص تائب يسر بقدوم قلب غائب


"জমকালো জামা পরা ঈদ নয়; ঈদ হলো তওবার জামা পরিধান করা এবং অদৃশ্য আল্লাহর সাথে মিলনের আনন্দে আন্দোলিত হওয়া।" (আততাবসিরাহ ২/১১৪)


৪. তওবা ও পারস্পরিক দোয়া

খলীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনে আবদুল আযীয (রাহ.) তাঁর গভর্নরদের চিঠি পাঠিয়ে ঈদের দিন বেশি বেশি দান-সদকা ও ইস্তিগফারের নির্দেশ দিতেন। তিনি নবীদের মতো রোনাজারি করে বলতে বলতেন,


رَبَّنَا ظَلَمْنَاۤ اَنْفُسَنَا وَ اِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَ تَرْحَمْنَا لَنَكُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ


"হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজ সত্তার ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা ও রহম না করেন, তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।" (সূরা আরাফ, ৭:২৩)


সবশেষে সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন, তা-ই ছিল তাঁদের শ্রেষ্ঠ আমল,


تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ

"আল্লাহ কবুল করুন আমাদের থেকে এবং আপনাদের থেকে।" (ফাতহুল বারী ২/৪৪৯)


শেষ কথা

নেককারদের ঈদ উদযাপন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আনন্দ মানেই গা ভাসিয়ে দেওয়া নয়। মুমিনের প্রতিটি আনন্দ যেন হয় আল্লাহর শুকরিয়া ও মাগফিরাতের মেলবন্ধন। আমাদের ঈদ উদযাপনও যেন হয় সুন্নাহর রঙে রঙিন।