আখেরী চাহার সোম্বা— সফর মাসের এক ভিত্তিহীন রেওয়াজ-রসম
সফর মাস এলেই আমাদের সমাজে "আখেরী চাহার সোম্বা" নামে একটি দিবসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিশেষ আমল, নামাজ, দোয়া ও রেওয়াজ প্রচলিত হতে দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসবের কোনো শরয়ি ভিত্তি আছে কি?
🔹 আখেরী চাহার সোম্বা কী?
"আখেরী চাহার সোম্বা" একটি ফারসি শব্দ। এর অর্থ সফর মাসের শেষ বুধবার।
*👉এই বছর সফর মাসের শেষ বুধবার পড়েছে ১২ আগস্ট।*
ইরান, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের কিছু অঞ্চলে এই দিনকে বিশেষভাবে পালন করা হয়। তবে কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা এ দিবসের কোনো স্বীকৃতি প্রমাণিত নয়।
🔹 এই দিবসের প্রচলন কীভাবে?
কিছু মানুষ মনে করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় একদিন গোসল করার পর কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। পরবর্তীকালে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষ দিন হিসেবে পালন করা শুরু হয়।
কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো—রাসূল ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী কিংবা তাবে-তাবেয়ীগণ কেউই এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো দিবস পালন করেননি বা কোনো বিশেষ ইবাদত নির্ধারণ করেননি। তাই এই ঘটনাকে ভিত্তি করে পরবর্তীকালে চালু হওয়া বিশেষ দিবস ও বিশেষ আমলের কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই।
🔹 কথিত "আখেরী চাহার সোম্বার নামাজ"
সমাজে একটি বিশেষ দুই রাকাত নামাজের কথা প্রচলিত রয়েছে, যেখানে সূরা ইখলাস নির্দিষ্ট সংখ্যকবার পড়া, নামাজ শেষে বিশেষ দরূদ ও দোয়া পাঠের কথা বলা হয়।
এ আমলের কোনো সহিহ ভিত্তি নেই।
আল্লামা আবদুল হাই লাখনবী (রহ.) তাঁর আল-আসারুল মারফূআহ ফিল আখবারিল মাওযূআহ গ্রন্থে এটিকে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মাসিক আল-কাউসার-এর "প্রচলিত ভুল" বিভাগেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
"এটি একটি ভিত্তিহীন আমল। আসল কথা হলো, এ দিবসটিই আবিষ্কৃত; সুতরাং এ দিবসকে কেন্দ্র করে আবিষ্কৃত আমলেরও কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই।"
🔹 সফর মাস কি অশুভ?
না।
জাহেলি যুগে আরবরা সফর মাসকে অশুভ মনে করত। ইসলাম এ বিশ্বাসকে বাতিল করেছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
📖 "রোগের কোনো সংক্রমণ নেই, সফরের কোনো কুলক্ষণ নেই, পেঁচার মধ্যেও কোনো কুলক্ষণ নেই।"
— সহিহ বুখারি, ৫৭১৭
অতএব সফর মাসকে বিপদ-আপদের মাস মনে করা বা এ মাসে বিশেষ দুর্ভাগ্যের বিশ্বাস রাখা ইসলামী শিক্ষা নয়।
🔹 একজন মুসলিমের করণীয়
✔️ কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত আমলের অনুসরণ করা।
✔️ সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ দিন মনে না করা।
✔️ কথিত আখেরী চাহার সোম্বার নামাজ, বিশেষ দোয়া বা বিশেষ ইবাদত থেকে বিরত থাকা।
✔️ অন্যান্য মাসের মতোই নিয়মিত নফল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, তাহাজ্জুদ, সোমবার-বৃহস্পতিবারের রোজা বা আইয়ামে বীযের রোজা পালন করা—তবে সফর মাসের বিশেষ আমল মনে করে নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
📖 "যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।"
— সহিহ বুখারি (২৬৯৭), সহিহ মুসলিম (১৭১৮)
আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন এবং সকল প্রকার বিদআত ও ভিত্তিহীন রেওয়াজ থেকে হিফাজত করুন। আমীন।
🔹 তথ্যসূত্র:
"সহিহ বুখারি"
"সহিহ মুসলিম"
"আল-আসারুল মারফূআহ ফিল আখবারিল মাওযূআহ — আল্লামা আবদুল হাই লাখনবী (রহ.)"
"মাসিক আল-কাউসার, "প্রচলিত ভুল" বিভাগ (সফর ১৪৪১ / অক্টোবর ২০১৯)"