FatwaBD logoFatwa.BD

১২ই রবিউল আউয়াল: উৎসব নাকি সুন্নাহ অনুসরণ?

M
Mufti Elias Khanমুফতি

জামিয়া দারুল উলুম নারায়ণগঞ্জ


রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসি বলেই এই প্রশ্নটা জরুরী — তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সঠিক পথ কোনটা?


রবিউল আউয়াল মাস এলেই আমাদের সমাজে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কোথাও জশনে জুলুশ, মিছিল, আলোকসজ্জা ও বিশেষ মাহফিলের আয়োজন হয়। আবার অনেক মুসলিম এসব আয়োজন থেকে দূরে থাকেন।


তাই কয়েকটি বিষয় জানা প্রয়োজন—রাসূল ﷺ-এর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে আমরা কতটুকু নিশ্চিত?

মিলাদের প্রচলন কখন থেকে শুরু হলো? আর এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা ও আমাদের করণীয় কী?


🌿 রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসা ঈমানের অংশ


রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসা প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানের দাবি।


তিনি ﷺ বলেছেন—


“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।” _(সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫)_


তাঁকে ভালোবাসা, তাঁর সীরাত জানা, দরুদ পাঠ করা এবং তাঁর দেখানো পথে চলা একজন মুমিনের জীবনের অংশ। তবে এই ভালোবাসা প্রকাশের পদ্ধতিও তাঁর শেখানো পথ অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন।


🌿 রাসূল ﷺ কবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন?


রাসূল ﷺ-এর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে সীরাত ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ১২ই রবিউল আউয়াল বহুল প্রচলিত একটি মত, কিন্তু নির্ভরযোগ্য গবেষণার আলোকে এই মতটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।


তবে তিনি ﷺ সোমবার জন্মগ্রহণ করেছিলেন—এ কথা সহিহ হাদিসে এসেছে।


সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে রাসূল ﷺ বলেন—


فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَيَّ


“এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।” _(সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২)_



🌿 জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত রাসূল ﷺ-এর আমল


উপরের হাদিসে রাসূল ﷺ তাঁর জন্মের কথা উল্লেখ করেছেন সোমবারের রোজার প্রসঙ্গে।


আর এই রোজা শুধু রবিউল আউয়াল কিংবা ১২ই রবিউল আউয়ালের জন্য নয়। সারা বছরের প্রতি সপ্তাহের সোমবারেই এই নফল রোজার সুন্নাহ পালন করা যায়।


অর্থাৎ তাঁর জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত যে আমলটি তাঁর নিজের জীবন থেকে সরাসরি পাওয়া যায়, সেটি বছরে একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।


🌿 সাহাবায়ে কেরাম কী করেছিলেন?


রাসূল ﷺ-কে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলেন তাঁর সাহাবায়ে কেরাম। তাঁর জন্য তাঁরা ঘরবাড়ি ও সম্পদ ছেড়েছেন, বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন, জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন।


কিন্তু তাঁদের জীবনে রাসূল ﷺ-এর জন্মকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে ধর্মীয় উৎসব বা জন্মবার্ষিকী পালনের প্রচলন পাওয়া যায় না।


খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ কিংবা সাহাবিদের পরবর্তী প্রথম প্রজন্মগুলোর মধ্যেও পরবর্তীকালের মতো মিলাদ উদযাপনের প্রচলন পাওয়া যায় না।


🌿 মিলাদের প্রচলন কখন থেকে?


আমাদের সমাজে যেটিকে সাধারণত “মিলাদ” বলা হয়, ইতিহাসের গবেষণায় সেটিকে সাধারণত “মাওলিদ” (Mawlid) নামে উল্লেখ করা হয়েছে।


মিলাদের প্রাথমিক ইতিহাসে ফাতিমীয় শাসনামলের মিসরে বিভিন্ন মাওলিদ আয়োজনের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে রাসূল ﷺ-এর পাশাপাশি আহলে বাইতের কয়েকজন সদস্য ও শাসককে কেন্দ্র করেও পৃথক মাওলিদ ছিল।


পরবর্তীতে সুন্নি মুসলিম সমাজেও এর আয়োজনের বিবরণ পাওয়া যায়। বিশেষভাবে সপ্তম হিজরি শতাব্দীর শুরুতে ইরবিলের শাসক মুযাফফরুদ্দীন কোকবুরি-র বড় পরিসরের মিলাদ আয়োজন ইতিহাসে আলোচিত হয়েছে।


এরপর বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ছড়িয়ে পড়ে এবং সময় ও স্থানভেদে এর ধরনও পরিবর্তিত হয়।


অর্থাৎ বর্তমান রূপের মিলাদ রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে চলে আসা বার্ষিক উৎসব নয়; এর আনুষ্ঠানিক বিকাশ হয়েছে পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে।


🌿 ইসলামে ধর্মীয় উৎসব ও বিদআত


রাসূল ﷺ মদিনায় এসে সেখানকার প্রচলিত দুটি আনন্দের দিনের পরিবর্তে আল্লাহর দেওয়া দুটি উত্তম দিনের কথা জানান—


ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। _(সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১১৩৪)_


আর দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলেছেন—


“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুনভাবে সংযোজন করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” _(সহিহ মুসলিম, ১৭১৮)_


এই নীতির ভিত্তিতে বিজ্ঞ আলেমগণ ঈদে মিলাদুন্নবীকে বিদআত হিসেবে গণ্য করেছেন। তাঁদের মূল বক্তব্য হলো—রাসূল ﷺ এটি বার্ষিক ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালন করেননি, সাহাবায়ে কেরামও করেননি এবং প্রথম যুগের মুসলিমদের মধ্যেও এর প্রচলন ছিল না।


🌿 তাহলে আমাদের করণীয় কী?


১২ই রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো বিশেষ ইবাদত শরিয়তে নির্ধারিত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় না।


রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা তাই একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছরের জীবনে নিয়ে আসি।


তাঁর সীরাত পড়ি, সহিহ সুন্নাহ জানি, বেশি বেশি দরুদ পাঠ করি এবং তাঁর চরিত্র ও শিক্ষা নিজেদের জীবনে ধারণ করি।


আর সোমবারের নফল রোজার সুন্নাহ পালন করলে তা শুধু রবিউল আউয়ালে নয়—সারা বছর সুযোগ অনুযায়ী পালন করি।


🌿 একটি দিন নয়—পুরো জীবন


১২ই রবিউল আউয়াল আসবে, আবার চলে যাবে। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর প্রতি একজন মুমিনের ভালোবাসা কোনো একটি দিনে সীমাবদ্ধ নয়।


তাঁর সুন্নাহ আমাদের ইবাদতে আসুক, তাঁর আদর্শ আমাদের পরিবারে আসুক; লেনদেনে তাঁর সততা, রাগের সময় তাঁর সংযম এবং মানুষের প্রতি তাঁর দয়া আমাদের চরিত্রে আসুক।


ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ হলো তাঁর অনুসরণ।


আল্লাহ আমাদের রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সত্যিকারভাবে ভালোবাসা ও তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের তাওফিক দিন।


আমিন। 🤲